[gtranslate]

প্রাসঙ্গিক ভাবনা; পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি/পদোন্নয়ন অভিন্ন নীতিমালা। প্রফেসর ড. মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,

প্রকাশিতঃ ৫:১৫ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি/পদোন্নয়ন এর জন্য বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। সম্ভবত এটি শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে প্রেরণ করা হয়েছ পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য।
নীতিমালার ভূমিকায় এর প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ থেকে ডিগ্রীধারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক ধরনের বৈষম্য বিরজমান। দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে জাতীয় বেতন স্কেল প্রণয়নের পর শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। মনে হয় এই দুটি বিষয়ের সমাধানের জন্য বর্তমান নীতিমালার প্রয়োজন দেখা দেয়।
ধারনা করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জরী কমিশন মনে করে বর্তমান নীতিমালা কার্যকর হলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রীধারী শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈষম্য থাকবে না। কমিশন কোন্ ধরনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হল তা বোধগম্য নয়। কারন পৃথিবীর কোন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রীধারী শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মান এক রকম হয় না, বৈষম্য বিরাজমান থাকেই।
হার্ভার্ড, এম আইটি, অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রীধারী শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মান অনেক উপরে। পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঐ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। এক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের সাথে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের বৈষম্য আছে বলেই মানের পর্যায় দেখানোর জন্য র‍্যাংকিং পদ্ধতি চালু আছে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রীধারী শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মান শুধু শিক্ষকদের মানের উপর নির্ভর করে না। এর সাথে অনেক বিষয় জড়িত। শিক্ষার্থীদের মান, পাঠ্যক্রম, পাঠ্যসূচী, ক্লাসরুম ও ল্যাব সুবিধা, ক্লাসরুমে ছাত্র সংখ্যা বা শিক্ষক-ছাত্রের অনুপাত, পাঠ্য পুস্তুকসহ গ্রন্থাগারের সুবিধা, ছাত্র-ছাত্রীদের আবাসন সুবিধা, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষা উপকরণ, প্রশাসনিক অবস্থাসহ আরও অনেক কিছু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মান তৈরি করে।
উপরের উল্লেখিত বিষয়গুলো সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এক রকম থাকেনা বা থাকতে পারেনা। উদাহারণ স্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা যায়। বিগত শতবর্ষে অতি ধীর গতিতে হলেও যে পর্যায়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থান করছে, একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কি সে পর্যায়ে আছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রীধারী শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মানের সাথে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মানের বৈষম্য থাকবেই। শুধু মঞ্জরী কমিশন কর্তৃক প্রণীত বিধিমালা দিয়েই বৈষম্য দূর করা যাবে না। শিক্ষার বিষয়টি সার্বিকভাবে দেখতে হবে।
কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সর্বক্ষেত্রেই ক্লাশের সেরা ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। এরাই পদোন্নতি পেয়ে অধ্যাপক হন। যেসব কারনে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ব্যতিক্রমের ঘটনা ঘটে তা থেকে খুব কম সংখ্যক প্রতিষ্ঠান মুক্ত থাকতে পারে। বলা যায় অভিন্ন নীতিমালার ভূমিকায় শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈষম্যের জন্য পরোক্ষ ভাবে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নয়ন /পদোন্নতির বর্তমান নীতিমালাকেই দায়ী করা হয়েছে এবং এর প্রতিকারের জন্য কমিশন কর্তৃক বর্তমান অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
অভিন্ন নীতিমালায় জিপিএ, সিজিপিএ, সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ইত্যাদির উপর জোর দেয়া হয়েছে। শিক্ষকদের এক-দুই বছর অভিজ্ঞতা বাড়লে বা ১/২ টি গবেষণা প্রবন্ধ বেশী প্রকাশ করলেই শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈষম্য দূর হয়ে যাবে এটি বিশ্বাস করার কোন কারন নেই। তবে শিক্ষার সাথে জড়িত সার্বিক বিষয়গুলোর উপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে শিক্ষার মান বাড়বে, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈষম্য কমে আসবে।
শুধু অভিন্ন নীতিমালা কার্যকর করলে যদি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈষম্য দূর হয় তা হলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নান-ধরনের সুযোগ সুবিধা তৈরী করার প্রয়োজন আছে কি? কমিশনের মতে শুধু অভিন্ন নীতিমালা কার্যকর করলেই বৈষম্য দূর হবে।
দ্বিতীয় অংশে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল প্রণয়নের পর শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কথা বলা হয়েছে। ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন কাঠামো নিয়ে তো কোন জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল না। কারন ১৯৭৭ সালে দি¦তীয় জাতীয় বেতন স্কেল হতে প্রফেসরগণ ১ম গ্রেড পেয়ে আসছিলেন। প্রায় ৩৮ বছর পর দেশে কি ঘটল অথবা শিক্ষকরা এমন কি করলেন যে শিক্ষকদেরকে ১ম গ্রেড হতে ৩য় গ্রেডে অবনমন করে সচিবদের কে ১ম ও ২য় গ্রেডে স্থান করে দেওয়ার প্রয়োজন হল। ১৯৭৭ সাল বা তার পূর্ব হতে বিশ^বিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র-ছাত্রীরাই প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ পেয়ে আসছেন। এরা অন্য চাকুরী না পেয়ে শিক্ষকতায় আসেননি- এসেছেন একান্তই শিক্ষকতার পেশাকে ভালবেসে। এক শ্রেণীর কিছু সরকারী কর্মকর্তা তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর সহযোগিতায় ২০১৫ সালের বেতন স্কেলে একটি মীমাংসিত বিষয়কে বিতর্কিত করে অন্যায়ভাবে ক্ষমতার দাপট।
দেখিয়ে শিক্ষকদেরকে ১ম গ্রেড হতে বঞ্চিত করেছেন। ঐ সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর নানা বক্তব্যে স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়েছিল যে তিনি তাঁর সাবেক পেশার উপর কাউকে স্থান দিতে রাজী ছিলেন না। তাঁর কথা বার্তা এবং অঙ্গ-ভঙ্গিতে মনে হয়েছে তিনি উপনিবেশিক আমলের বিদেশী কর্মকর্তা। ‘বোগাস’ এবং ‘রাবিস’ শব্দ দুটি নানা ভাবে ব্যবহার করে তিনি নিষ্ঠুর ভাবে শিক্ষকদের অপমান করেছেন। কিছু শিক্ষক নেতার দালালী ও বিশ্বাসঘাতকতার কারনে শিক্ষকরা অপমানের জবাব দিতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে দালালদের কেউ কেউ পুরস্কৃত হয়েছেন।
ক্লাসের সেরা ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষক হন। দীর্ঘদিন চাকুরী করার সময় এঁরা অফিস বা বাসায় একটি ল্যান্ড ফোন পাননা, হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের মতই চিকিৎসা নেন, গাড়ী কেনার বা গাড়ীর রক্ষনাবেক্ষনের জন্য কোন ঋণ বা ভাতা পাননা, পদোন্নতির জন্য উচ্চতর ডিগ্রী অত্যাবশ্যক হলেও একজন শিক্ষক সরকারী ভাবে কোন সাহায্য সহযোগিতা পাননা। শিক্ষকরা নিজের চেষ্টায় উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করে থাকেন। কতজন শিক্ষক নিজের অর্থে সন্তানদেরকে বিদেশে শিক্ষা দিতে পারেন? সরকারী সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকরা নিদারুন ভাবে অবহেলিত। এখনও তাঁরা গল্পের দরিদ্র ‘পন্ডিত মশাই’ এর অবস্থায় রয়ে গেছেন।
মঞ্জরী কমিশন যে দুটি কারন দেখিয়ে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে তা যুক্তিতে টিকেনা। শিক্ষকদের ধারনা বিশ^বিদ্যালয় সমূহের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করা এবং শিক্ষকদের পদোন্নতি/পদোন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করাই অভিন্ন নীতিমালার উদ্দেশ্য। ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে শিক্ষকদেরকে ১ম গ্রেড হতে বঞ্চিত করে বিশেষ মহল সন্তুষ্ট হতে পারেননি, এখন তাঁরা নতুন উদ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন হরণ করার কাজে নেমেছেন। মনে হয় এই বিশেষ মহল শান্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অশান্ত করার কাজে লিপ্ত।
ধারনা করা যায় মঞ্জরী কমিশনের অনেকেই বর্তমান নীতিমালার অধীনে অধ্যাপক হয়ে যোগ্যতার সাথে দেশের সেবা করছেন। বর্তমান নীতিমালা যদি তাঁদের মত যোগ্য, দক্ষ ও নীতিবান শিক্ষক তৈরী করতে পারে তাহলে এখন এমন কি ঘটল যে নতুন করে অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করতে হবে?
আশির দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অধিকাংশ বিভাগীয় প্রধান ও ভাইস-চ্যান্সেলরগণ স্বৈরাচারী কায়দায় পদোন্নতি/পদোন্নয়নের বিষয়গুলো পরিচালনা করতেন। বিভাগের কোন পদের জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক থাকার পরও বছরের পর বছর পদ পূরণের বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে ফেলে রাখা হত। তাঁরা স্বচ্ছ কোন নীতিমালা না থাকার সুযোগ নিতেন। বিভাগীয় প্রধান ও ভিসি মহোদয়গণের নির্যাতনের বিরুদ্ধে শিক্ষকরা এক সময় রুখে দাঁড়ান। শিক্ষকগণ নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদোন্নয়নের নীতিমালা তৈরি করে আন্দোলনে নামেন এবং দাবী আদায় করে ঘরে ফিরেন। বর্তমান নীতিমালাটি এমনি এমনি আসেনি। এর জন্য শিক্ষকদের দীর্ঘদিন আন্দোলন করতে হয়েছে। বর্তমান নীতিমালা শিক্ষকদের আন্দোলনের ফসল।
জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ সব সময় প্রস্তুত। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈষ্যম দূর করার জন্য শিক্ষকবৃন্দ সদা সচেষ্ট। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে পাঠ দান করেন। শিক্ষার্থীদের মান তাঁদের চেয়ে বেশি কে জানে?
ক্লাসরুম, পরীক্ষার খাতা ও মৌখিক পরীক্ষা সর্বত্রই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মান বিচার করে থাকেন। মোবাইল ফোন, রেগিং ইত্যাদি যে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন উপদ্রব তা শিক্ষকরা খুব ভাল ভাবে জানেন। শিক্ষাক্ষেত্রে আরও অনেক বিষয় আছে যা শিক্ষকরাই জানেন।
এমনি অবস্থায় মঞ্জরী কমিশনের সদস্যদের প্রতি আহবান- প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব না করে সবার কাছে গ্রহনযোগ্য একটি নীতিমালা তৈরি করেন। অনুগ্রহ করে একক ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপর কিছু চাপিয়ে দিবেন না।